পবিত্র আশুরা কি?

মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। রাসূল (ﷺ) নিজে মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা নামে অভিহিত করেছেন। আরবি শব্দ আশির বা আশরুন থেকে আশুরা শব্দটি উৎপন্ন, যার অর্থ দশ বা দশম।

এ মহররম মাসের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মুসলিম জাতির ইতিহাসের অগণিত সুখকর ও বেদনাময় ঐতিহাসিক ঘটনাবলি। যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আছে ইসলামি সমাজ-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য অর্থাৎ মুসলিম জাতির শিক্ষণীয় আদর্শ ঘটনাবলি। ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ ইয়াওমে আশুরা একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে অবিস্মরণীয় ও মহিমান্বিত।

 মহররম মাসের রোযাঃ

রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন,“রমজানের পর সর্বোত্তম রোযা হলো মহররমের রোযা (আশুরার রোযা) এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। [সহীহ মুসলিম_হাদিস-১১৬৩] আশুরার রোযার ফজিলতঃ- রাসূল (ﷺ) বলেন, “আমি আল্লাহর নিকট প্রতিদিন প্রত্যাশা করছি আরাফার রোযা বিগত বছর ও আগত বছরের গুনাহ মার্জনা করবে। আরও প্রত্যাশা করছি আশুরার রোযা বিগত বছরের গুনাহ মার্জনা করবে।”

[সহীহ মুসলিম_হাদিস-১১৬২]

আশুরার রোযা রাখার কারণ

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) যখন হিজরত করে মদিনায় পৌঁছেন, তখন তিনি দেখলেন যে মদিনার ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আশুরার দিনে তোমরা রোজা রেখেছ কেন? তারা উত্তর দিল, এই দিনটি অনেক বড়। এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ) ও বনি ইসরাইলকে ফিরআউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন আর ফিরআউন ও তার বাহিনীকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হযরত মুসা (আ) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি। তাদের উত্তর শুনে নবী করিম (ﷺ) বললেন, হযরত মুসা (আ) এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে অধিক হকদার। অতঃপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকে তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করলেন।

[সহীহ বুখারী-৩৩৯৭] [সহীহ মুসলিম-১১৩৯]

কয়টি রোযা রাখবো?

রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো। তবে এতে যেন ইহুদিদের সঙ্গে মিলে না হয়ে যায় সেজন্য আশুরার রোযা রাখার ক্ষেত্রে মহররম মাসের ১০ তারিখের রোযার সঙ্গে আগে বা পরে একটি রোযা মিলিয়ে রাখতে হবে। শুধু ১০ তারিখ রোযা রাখা মাকরুহ। [সহীহ মুসলিম_হাদিস-১১৩৪]

 যে সব কারণে আশুরা মর্যাদাপুর্ণ

আশুরার দিনে বহু স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ঘটনাবলী নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

↪ আশুরাতেই জন্ম গ্রহণ করেন হযরত ইব্রাহীম (আ)।
↪ আশুরাতেই উম্মতে মুহাম্মদীর গুনাহ মাফ হয়।
↪ হযরত ঈওসা (আ) জন্ম গ্রহণ করেন আশুরাতেই।
↪ আসমান-জমিন সৃষ্টি করা হয়েছে মহররম মাসেই।
↪ হযরত জিব্রাইল (আ) এ দিনেই দুনিয়াতে আগমন করেন।
↪ হযরত নূহ (আ) এ দিনেই জমিনে অবতরণ করেন।
↪ আশুরাতেই দাউদ (আ) এর তওবা কবুল করা হয়।
↪ হযরত ইউনুস (আ) এ দিনেই মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।
↪ হযরত সোলায়মান (আ) পুনঃ বাদশাহী লাভ করেন আশুরাতেই।
↪ হজরত ইব্রাহিম (আ) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে এ দিনেই মুক্তি লাভ করেন।
↪ হযরত ইসা (আ) কে আল্লাহ সশরীরে আসমানে তুলে নেন এই আশুরাতেই।
↪ মা হাওয়া (আ) এর সাথে আদম (আ) পুনরায় সাক্ষাত হয় এই ১০ই মহররম।
↪ আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ) কে মহান আল্লাহ এ দিনেই সৃষ্টি করেছেন।
↪ হজরত ইয়াকুব (আ) তাঁর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ) কে পুনরায় ফিরে পান এ দিনেই।
↪ চাঁদ-সূর্য,গ্রহ-নক্ষত্র,সাগর-মাহাসাগর,পাহাড়-পর্বত, সৃষ্টি করা হয় এই মহররম মাসেই।
↪ হযরত ইউছুফ (আ) তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আ) এর সাথে মিলিত হন এই আশুরাতেই।
↪ হজরত আইয়ুব (আ) দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগের পর আরোগ্য লাভ করেন এ দিনেই।
↪ আল্লাহপাক দুনিয়াতে প্রথমবার রহমত নাজিল করেন ও রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করেন আশুরাতেই।
↪ আশুরাতেই আল্লাহপাক হযরত ইদ্রিস (আ) কে জীবিত করেন এবং তাকে জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয়।
↪ হাদিসে উল্লেখ আছে এদিনেই অর্থাৎ ১০ই মহররম আশুরা দিবসেই শুক্রবারে হজরত ইসরাফিল (আ) এর সিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে এ বিশ্ব জগত ধ্বংস হবে।
↪ হজরত নূহ (আ) ও তার অল্পসংখ্যক ঈমানদার উম্মতসহ কয়েক দিনের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে নৌকায় চড়ে ৪০ দিনের মহাপ্লাবনের পর এদিনেই নিরাপদে মুক্তি লাভ করেছিলেন।
↪ হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক হজরত ইমাম হোসাইন (রা) কে নির্মমভাবে শহীদ করা হয় এ আশুরাতেই।
↪ এদিনেই হজরত মুসা (আ) এর তুর পাহাড়ে আল্লাহ পাকের সঙ্গে কথোপকথন হয়, তাওরাত কিতাব লাভ, সদলবলে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়া এবং ফেরাউন ও তার দলবলসহ তাতে ডুবে ধ্বংস হওয়ার ঘটনা ঘটে।

বিদ্রঃ- বাংলাদেশের বন্ধুরা, যারা আশুরার রোযা রাখতে চান, তারা আগামি ৯ ও ১০ই মহররম, ইংরেজী
৯ এবং ১০ই সেপ্টেম্বরের দুইটি রোযা রাখবেন।

এটি আমাদের উপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। এক দিনের রোযার মাধ্যমে বিগত বছরের গুনাহ মার্জনা হয়ে যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ মহান অনুগ্রহকারী। বহু সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রাসূল (ﷺ) আশুরা দিবসে নিজে রোযা রেখেছেন এবং অন্যদেরও রোযা রাখতে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাই বন্ধুরা আসুন আমরা নিজেরা এই রোযাটি রাখি এবং অন্যদেরও রোযাটি রাখতে উৎসাহিত করি। হে আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ফজিলতপূর্ণ রোযাটি রাখার তাওফীক দান করেন। আমিন।।